আজ ৬ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২০শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু (১৭ র্মাচ-১৯২০ থেকে ১৫ আগষ্ট ১৯৭৫)

Sharing is caring!

May be an image of 1 person

মধুমতি নদীর তীর ঘেষে পরম মমতায় নতুনের অপেক্ষায় দাড়িয়ে আছে ছায়া সুনিভির শান্তির গ্রাম টুঙ্গিপাড়া,পুরোনো ইটের লাল দালানের পাশে কোন এক সন্ধ্যায় সন্ধ্যা প্রদীপ হয়ে জ্বলে উঠেছিল একটি বাতি । সেই বাতির আলোয় আলোকিত হয়েছিল হাজার বছরের নিপিড়ন আর বঞ্চনার কালো ইতিহাসের পান্ডু লিপি। তার বেড়ে উঠা আন্দোলিত করেছে আমাদের ঘুনে ধরা সমাজ সংসারকে। তার হাতের ইশারায় জেগেছে স্বাধীনতার সূর্য। তাইতো বঙ্গবন্ধু একটি নাম একটি ইতিহাস, বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ বাংলাদেশ মানেই বঙ্গবন্ধু। আর সেই বঙ্গবন্ধু টুঙ্গিপাড়া গ্রামে শেখ লুৎফর রহমান ও সায়েরা বেগমের কোল আলোকিত করে আসে এক খোকা যার নাম শেখ মুজিবুর রহমান। নিকটবর্তী গিমাডাঙা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার পাঠ শুরু হয় এবং দুবছর পরে তিনি গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত সেখানেই পড়াশোনা করেন।পরে চোখের সমস্যার কারণে তিনি অনেকদিন পড়াশোনা করতে পারিনি। ১৯৩৭ সালে গোপালগঞ্জে মথুরানাথ ইনষ্টিটিউট মিশন স্কুলে ৭ম শ্রেণিতে ভর্তি হন।শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব শুরু হয় মথুরানাথপুর মিশন স্কুল থেকেই ১৯৩৮ সালে স্কুলটি পরিদর্শনে এসেছিলেন তৎকালিন মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা একে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি। স্কুলের ছাদ সংস্কারের জন্য বেশ কয়েকজন ছাত্র নিয়ে তখন তাদের পথরোধ করেন শেখ মুজিব। এভাবেই শুরু হয় তার নেতৃত্বের।১৯৪০ সালে শেখ মুজিব নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেড়ারেশনে যোগদেন। পরবর্তীতে তিনি গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পাস করেন।১৯৪১ সালে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ভর্তি হন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে। ১৯৪৬ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শে আসেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে ধ্বনিত হয় এক কালপুরুষের দীপ্ত পথচলা। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন তিনি। রাজনৈতিক অঙ্গনে শেখ মুজিবের সম্পৃক্ততা বেড়ে চলে। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় এবং তিনি এর সঙ্গে যুক্ত হন। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে হরতাল পালনের সময়ে ঢাকায় গ্রেপ্তার ও কারারুদ্ধ হন। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার অপরাধে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত ও গ্রেপ্তার হন। বাংলার নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের শোষণ মুক্তির সংগ্রামে শেখ মুজিবুর রহমান নেতৃত্ব স্থানে আসীন হন।এ কথা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, বঙ্গবন্ধু মাত্র ৩০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে কেবল পাকিস্তান আমলেই ১৮ বার কারারুদ্ধ হয়ে ১২ বছর জেলে কাটিয়েছেন। ২৪টি মামলা তিনি সাহসের সঙ্গে লড়েছেন এবং দুইবার মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে দেশবাসীর অকুণ্ঠ ভালোবাসায় ফিরে এসেছেন। তিনিই প্রথম নেতা যিনি মাতৃভাষায় প্রথম জাতিসংঘে ভাষণ দিয়ে বাংলা ভাষার মুখ উজ্জ্বল করেন। পৃথিবীর আর কোনো নেতা জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা ছাড়া তার স্বভাষায় জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছেন কিনা সে ইতিহাস আমাদের অজানা। বাংলা ভাষার সম্মানে পৃথিবীব্যাপী ২১ ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে। বাঙালি হিসেবে এটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। এমনকি ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রমনার রেসকোর্স ময়দানে যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়ে বঙ্গবন্ধু পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন সেটাও আজ ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্বঐতিহ্যের অংশীদার। আজ বাঙালি শ্রেষ্ঠ বঙ্গবন্ধুর নামে সমগ্র বিশ্বে ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি হয়েছে। আবহমানকালের প্রবহমান মানুষ তার নামে উদ্দীপ্ত হবে অনুপ্রাণিত হবে, অনুরণিত হবে, ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনিতে। এটা ধ্রব সত্য।’একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবী। একজন বাঙালি হিসেবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান) সময় বয়ে চলে অবিরাম। সময়ের পথ-পরিক্রমায় কিছু স্মৃতি হারিয়ে যায়, আবার কিছু স্মৃতি মনের মণিকোঠায় স্থায়ী আসন পেতে নেয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। বঙ্গবন্ধু মানেই প্রতিটি বাঙালির মনের মুকুরে ভেসে ওঠে এক বীর নায়কের প্রতিচ্ছবি। ভেসে ওঠে বাংলার প্রতিটি নির্যাতিত মানুষের প্রতি দরদ ও ভালোবাসা সিক্ত একটি মানুষের মুখ। যে অসাধারণ ধৈর্য, সাহস ও দৃঢ়তা নিয়ে তিনি তার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামে অসংখ্য অগ্নি-পরীক্ষার মধ্যদিয়ে পাকিস্তানি শাসক ও শোষকচক্রকে রুখে দাঁড়িয়ে একটি স্বাধীন দেশের জন্ম দিয়েছেন, তার তুলনা বিশ্বে বিরল। প্রতিটি সংগ্রামেই শেষ পর্যন্ত তিনি বিজয়ীর মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তার অদম্য সাহস, ইস্পাত-কঠোর সংকল্প, আদর্শ ও লক্ষ্যের প্রতি নিষ্ঠা এবং জনগণের ঐক্য ও সংহতিতে প্রগাঢ় বিশ্বাস থেকে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করার মুহূর্তেও তিনি এক বিন্দু সরে আসেননি। তিনিই বীর যিনি মৃতূকে ভয় পান না। আমৃত্যু স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য নিমগ্ন ছিলেন বলেই তিনি স্বাধীনতার মহান স্থপতি, তিনিই বাঙালির ‘জাতির পিতা’।পরিশেষে সবাইকে বলে যাই মানুষ হিসেবে কেউ ভুল ত্রুটি ত্রুটির উর্দ্ধে নয় তাই প্রিয় এই মানুষের সমাধির পাশে দাড়িয়ে কবি সৈয়দ ফখরুদ্দিন মাহমুদের ভাষায় বলে যাই -“দাঁড়াও পথিক বর”। যথার্থ বাংগালী, যদি তুমি হওক্ষণিক দাঁড়িয়ে যাও, এই সমাধি স্থলে।এখানে ঘুমিয়ে আছে, বাংগালীর সর্বশ্রেষ্ঠ নেতাএদেশের মুক্তি দাতা, বাংলার নয়নের মণি।শত দুঃখ জ্বলা স’য়ে, জীবনের বিনিময়ে যিনিবাংগালীর দিয়ে গেছে স্থান, বিশ্বের দুয়ারে।বিনিময়ে দিয়েছে আত্নাহুতি, তার পূন্যময়ী সতীনিস্পাপ কনিষ্ট সন্তান, পিতার আদুরে “রাসেল”,স্নেহের পরশ পেতে, সর্বদা ছিল যে তারপিতার কাছে কাছে ঘেঁষে।নবপরিণীতা পুত্র বধু দু’টি, হায়; কেহই তো পায়নি রেহাইউম্মাদের নির্মম বুলেট হতে।হতভাগ্য বাংগালী আজ তাই, অভিশপ্ত জাতি।সুতরাং মুখ ঢাকো, মুখ ঢাকো তুমি।এ আমার প্রলাপ নহে, এ আমার পাপের জ্বালা।এ আমার অন্তরের ব্যাথা।তাই, হে পথিক বর! আরো একটু দাঁড়িয়ে যাও।হেথা পূণ্য ভূমে,”বাংগালী তীর্থ ভূমি”, টুংগীপাড়া গ্রামে।জীবনে কখনও যে একদন্ড তরে লভেনি বিশ্রামআজ সে, গহন মাটির গোরে, তাঁরই শান্তির নীড়েযেন করিছে আরাম।পার্শ্বে শায়িতা আছে স্নেহময়ী মাতা, আরো আছে পূণ্যবান পিতা।কৃতজ্ঞ জাতি। কী আর কহিব তোরেজীবনে তো নিয়েছিস শুধু, প্রতিদানে কিছুই কিদেবার নেই তোর। যদি থাকেহে পথিক! তবপরে মোর মাত্র একটি অনুরোধ–তোমার হাতের ঐ–“ফুল মালা” হ’তেঅন্তত একটি “পাপড়ি”, আর একবিন্দু “অশ্রুজল”ফেলে যেও ধীরে– অবশ্য ক’রে এই সমাধি স্থলেআর এমনি করেই “তার কাছে সমগ্র জাতির ঋণ”শুধরাতে হবে পলে পলে।আমার বিশ্বাস। এরই মধ্য দিয়ে বাংগালীর ঘুচিবে অভিশাপ,আসিবে সুদিন।

মোঃরফিকুল ইসলাম, সহ-সভাপতি (সার্ক মানবাধিকার ফান্ডোশন, কিশোরগঞ্জ জেলা শাখা)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর
Oporadh Bichitra